ঢাকা শুক্রবার, ২রা ডিসেম্বর ২০২২, ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯


বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে কালীগঞ্জের বেলাই বিল


প্রকাশিত:
১৭ অক্টোবর ২০২২ ১৩:২৭

আপডেট:
২ ডিসেম্বর ২০২২ ০৯:০৭

 

গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার বেলাই বিলকে বলা হয় জেলার দেশি মাছের ভান্ডার। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে এ বিলের পানি দিয়ে চাষাবাদ করেন জেলার চার উপজেলার কৃষক। তবে কলকারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে বিশাল ঐ বিল। এতে মরে যাচ্ছে মাছ এবং কমে যাচ্ছে ফসলের উৎপাদন।


জানা গেছে, কালীগঞ্জ উপজেলাসহ জেলার চার উপজেলায় বেলাই বিলের অবস্থান। এক সময় এ বিলের পানি ছিল স্বচ্ছ টলটলে। প্রাকৃতিকভাবেই পাওয়া যেত রুই-কাতল ছাড়াও কই, শিং, মাগুর, পুঁটি, মেনি, টাকি, শোল, ট্যাংরা, গুতুম, বেলে, মলা, ছোট বাইমসহ হরেক রকম দেশি মাছ। ১০ বছর আগেও গাজীপুর জেলার মাছের চাহিদার ৫০ ভাগ খাল-বিল, নদী-নালা থেকে আসত। তার মধ্যে ৩০ ভাগই পাওয়া যেত এ বেলাই বিল থেকে। এক সময় বিলের মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন বিলপাড়ের হাজার জেলে। গাজীপুর জেলা ছাড়াও রাজধানী ঢাকা, নরসিংদী ও আশপাশের জেলায় সরবরাহ করা হতো বেলাই বিলের মাছ। দেশি মাছের জন্য বেলাই বিল ছিল জেলার ঐতিহ্য। কিন্তু কলকারখানার বিষাক্ত-বর্জ্যে দূষিত হয়ে পড়েছে বেলাই বিলের পানি। 


সরেজমিন দেখা গেছে, চিলাই, পারুলী, তুরাগ ও বালু নদ এবং মোগরখাল, হায়দারাবাদ খাল, জয়রামবের খালসহ ১০-১২টি নদনদী ও খালের পানি জেলার বিভিন্ন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বেলাই বিলে গিয়ে মিশেছে। এসব নদী ও খাল দিয়ে  স্রোতের মতো কারখানার বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য বেলাই বিলে গিয়ে পড়ছে। আর এতে দূষিত হচ্ছে এ বিলের পানি। তিতারকূল এলাকায় বিলে খর জাল দিয়ে মাছ ধরছিলেন সুধন্য দাস।

তিতারকূল এলাকায় বিলে খর জাল দিয়ে মাছ ধরছিলেন সুধন্য দাস। তিনি জানান, তিন-চার বছর আগেও প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। এক ঘণ্টায় যে মাছ পাওয়া যেত এখন সারা দিনেও তার অর্ধেকও পাওয়া যায় না। কারখানার পানিতে বিষ আছে। ঐ বিষ, বিল শেষ করে দিছে। বিষাক্ত পানিতে পোনা মাছ মরে যাওয়ায় মাছের বৃদ্ধি হচ্ছে না বলেও পানিতে ভাসতে থাকা মরা মাছ দেখিয়ে জানান সুধন্য দাস। কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের গোয়ালবাড়িয়া গ্রামের কৃষক শাহজাহান মিয়া বলেন, শুধু মাছ নয়, দূষিত পানির কারণে ধান উৎপাদনও কমে গেছে। আগে বিলের পানিতে গোসল, গৃহস্থালি কাজসহ কৃষিজমি চাষাবাদ করা হতো। এখন বিলের পানিতে নামা যায় না। পানি লাগলে শরীর চুলকায়, ঘা হয়। কৃষকের সর্বনাশ করছে কারখানার মালিকরা। 

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির হোসেন বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে কলকারখানার বিকল্প নেই। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই প্রাকৃতিক জলাধারকে ধ্বংস করে নয়। কারখানার বর্জ্যে গাজীপুর জেলার সব নদনদী, খাল-বিল ও জলাশয় দূষিত হয়ে পড়ছে। একইভাবে দূষিত হচ্ছে বেলাই বিল। কারখানাগুলো ইটিপি ব্যবহার না করার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নদীর মতোই প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষা করতে না পারলে আমাদের প্রাকৃতিক দেশীয় মাছ এ অঞ্চল থেকে বিলুপ্তি ঘটবে। এ জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রশাসন এবং কলকারখানা অধিদপ্তরকে আরো সচেষ্ট হতে হবে। 

বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মো. আনোয়ার সাদত বলেন, বেলাই বিল গাজীপুর জেলার গর্ব। দেশীয় মাছ, ধান এবং চাষাবাদে এ বিলের রয়েছে বিরাট ভূমিকা। দূষণের কবলে পড়ে শুধু মাছের উৎপাদন কমেছে তা নয়। উৎপাদন কমেছে ধানেরও। তাই বিলের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য দূষণ বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

গাজীপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. কায়সার মুহাম্মদ মঈনুল হাসান জানান, গাজীপুর জেলায় দেশীয় মাছের সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার বেলাই বিল। কয়েক বছর আগেও এ বিল থেকে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। দূষণের কারণে এবং ভরাট হয়ে যাওয়ায় আগের মতো এখন আর মাছ পাওয়া যায় না। দূষণ বন্ধের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে বিষয়টি অবহিত করেছেন বলেও তিনি জানান। এ ব্যাপারে গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নয়ন মিয়া বলেন, কোন কোন কারখানার বর্জ্যে ঐ বিলের পানি দূষিত হচ্ছে তা তদন্ত করে বের করা হবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


বিষয়:



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top