ঢাকা রবিবার, ১৯শে মে ২০২৪, ৬ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

দূষণমুক্ত পরিবেশের সিদ্ধান্ত না নিলে নীতিনির্ধারকদের এই সময়ের রাজাকার বলা হবে: ইকবাল হাবিব


প্রকাশিত:
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ১৭:২৮

আপডেট:
১৯ মে ২০২৪ ১০:০৬

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দূষণমুক্ত পরিবেশের নীতি না দিলে নীতিনির্ধারকদের এই সময়ের রাজাকার বলা হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। আজ মঙ্গলবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) আয়োজিত বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে করণীয় শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন এ কথা বলেন তিনি।

বাপার যুগ্ম-সম্পাদক অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার তাঁর লিখিত বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের ‘এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্স-২০২৩’-এর বরাত দিয়ে জানান, সারা বিশ্বেই বায়ুদূষণের ফলে মানুষের আয়ু কমতে শুরু করেছে। দূষিত বায়ুর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু ২ বছর ৪ মাস কমছে। বাংলাদেশিদের গড় আয়ুও কমেছে ৬ বছর ৮ মাস।

কামরুজ্জামান বলেন, ‘বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বের সব মানুষের গড় আয়ু ২ বছর ৪ মাস কমছে। অপর পক্ষে বাংলাদেশের একেকজন নাগরিকের গড় আয়ু কমছে ৬ বছর ৮ মাস। এ ছাড়া ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজিজেস অব দ্য চেস্ট অ্যান্ড হসপিটালে ২০২১ সালে আউটডোর এবং জরুরি বিভাগ মিলিয়ে ২ লাখ ১০ হাজার রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। সাত বছর আগে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৮৫ হাজার। অন্যদিকে রাজধানীর জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটের হিসাবে দেখা গেছে, গত বছরের জুলাই মাসে আউটডোর ও জরুরি বিভাগসহ হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১২ হাজারের কিছু বেশি। এবারের (২০২৩) জুলাইয়ে সেই সংখ্যা ১৪ হাজার পার হয়েছে।’

লিখিত বক্তব্যে আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘গাজীপুর জেলার বাতাসে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা, যার ব্যাস সাধারণত ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার বা এর চেয়ে ছোট (পিএম ২.৫)। এর পরিমাণ প্রতি ঘনমিটারে ৮৯ দশমিক ৮ মাইক্রোগ্রাম পাওয়া যায়। এই মান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার (অর্থাৎ ৫ মাইক্রোগ্রাম) চেয়ে ১৮ গুণ বেশি এবং নির্ধারিত (বার্ষিক) মান মাত্রার চেয়ে ছয় গুণ বেশি। ২০২২ সাল পর্যন্ত অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা ২ দশমিক ৫-এর জন্য নির্ধারিত (বার্ষিক) প্রতি ঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম দূষিত জেলা হিসেবে পাওয়া গেছে সিলেট শহর, যার প্রতি ঘনমিটারে ৪৮ দশমিক ৫ মাইক্রোগ্রাম এবং এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মানমাত্রার চেয়ে ৯ দশমিক ৭ গুণ বেশি এবং বাংলাদেশের নির্ধারিত জাতীয় আদর্শ (বার্ষিক) মানমাত্রার চেয়ে ৩ দশমিক ২৩ গুণ বেশি।

প্রাকৃতিক ও আবহাওয়াজনিত কারণ, নগর পরিকল্পনায় ঘাটতি, আইনের দুর্বলতা, আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতা, ভৌগোলিক কারণ এবং জনসংখ্যার ঘনত্বকে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ উল্লেখ করে কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘ক্যাপসের গবেষণা থেকে পাওয়া যায় যে, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণকাজ থেকে ৩০ শতাংশ, ইটভাটা ও শিল্প কারখানা থেকে ২৯ শতাংশ, যানবাহন থেকে ১৫ শতাংশ, আন্তদেশীয় বায়ুদূষণ থেকে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, গৃহস্থালি ও রান্নার চুলার কাজ থেকে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ এবং বর্জ্য পোড়ানো থেকে ৮ শতাংশ বায়ুদূষণ ঘটে।’

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, সিসা দূষণের ফলে বাংলাদেশে প্রতিবছর হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ১ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ এবং এই কারণে শিশুদের আইকিউ কমে যাচ্ছে। ফলে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলেও জানান এই পরিবেশবিদ।

বায়ুদূষণে বাংলাদেশিদের প্রত্যাশিত আয়ু কমতে পারে প্রায় ৭ বছরবায়ুদূষণে বাংলাদেশিদের প্রত্যাশিত আয়ু কমতে পারে প্রায় ৭ বছর দেশের বাতাসে এমন দূষণের পেছনে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা অপরিকল্পিত ইটভাটা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনকে দায়ী করেছেন স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, ‘দেশে শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বিকলাঙ্গ মানুষের সংখ্যাও। এসব বৃদ্ধির মূল কারণ হচ্ছে বায়ুদূষণ। অপরিকল্পিত ইটভাটা, বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি এবং নানা ধরনের কলকারখানার কারণে এসব দূষণ বাড়ছে। আর এসব অবৈধ ও অপরিকল্পিত কাজ করা হচ্ছে প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষদের ছত্রছায়ায়। পেছনে থাকা প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও ক্ষমতার কাছাকাছি মানুষদের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাঁরা একটা বাসযোগ্য দূষণমুক্ত পরিবেশ দেবেন কি না। তা না হলে আমরা তাঁদের এই সময়ের রাজাকার বলে আখ্যা দেব।’

এসব সমস্যার সমাধানে নির্মাণকাজের সময় নির্মাণ স্থান ঘেরাও দিয়ে রাখতে হবে এবং নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের সময় ঢেকে নিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রচুর পরিমাণ গাছ লাগাতে হবে এবং ছাদবাগান করার জন্য সবাইকে উৎসাহিত করতে হবে, দূষিত শহরগুলোর আশপাশে জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে। নির্মল বায়ু আইন, ২০১৯ যত দ্রুত সম্ভব প্রণয়ন করতে হবে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও সচেতনতা তৈরির জন্য পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। নিয়মিত বায়ু পর্যবেক্ষণ স্টেশনের (ক্যামস) ব্যাপ্তি বাড়িয়ে ঢাকা শহরের সব এলাকাকে এর আওতাধীন করতে হবে। এ ছাড়া বায়ুদূষণের পূর্বাভাস দেওয়ার প্রচলন করতে হবে। পরিবেশ ক্যাডার সার্ভিস এবং পরিবেশ আদালত চালু ও কার্যকর করতে হবে বলেও বেশ কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বাপার পক্ষ থেকে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন বাপার সভাপতি নুর মোহাম্মদ তালুকদার, সহসভাপতি অধ্যাপক এম শহীদুল ইসলাম এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীরসহ আরও অনেকে।

 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top