ঢাকা শুক্রবার, ২রা ডিসেম্বর ২০২২, ১৯শে অগ্রহায়ণ ১৪২৯

জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে শিশুরা


প্রকাশিত:
২১ মে ২০২২ ২২:৫৫

আপডেট:
২ ডিসেম্বর ২০২২ ০৯:৪৭

 

খুলনার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের কিশোরী নার্গিস আক্তার (১৩)। বাড়ির কাছাকাছি একটি মাদ্রাসায় সে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের মাদ্রাসাটি ভেঙে যায়। এতে বন্ধ হয়ে যায় নাগির্সের লেখাপড়া। পরিবারের সিদ্ধান্তে নার্গিসকে উপার্জনের জন্য পাঠানো হয় রাজধানীতে। একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করত সে। একদিন ভুল করে টেবিলের দামি গ্লাস ভেঙে ফেলে। শারীরিক নির্যাতনের ভয়ে সেই বাসা থেকে নার্গিস পালিয়ে যায়। এরপর অচেনা শহরে দুই-তিন হাত বদল হয়ে পাচারের সময় আবারও পালিয়ে বাঁচে মেয়েটি। এভাবে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে একটা বছর গড়িয়ে অবশেষে বাড়ি ফেরে সে। বাড়ি ফেরা মাত্র বিয়ে হয়ে যায় নার্গিসের। তবে এ ঘটনা কেবল নার্গিসের জীবনে নয়, এমন ঘটনা উপকূলীয় অঞ্চলের বেশির ভাগ শিশু-কিশোরের জীবনে অহরহ ঘটছে।

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক তহবিলের (ইউনিসেফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতি তিন জন শিশুর মধ্যে এক জন বা প্রায় ২ কোটি শিশু বিরূপ আবহাওয়া, বন্যা, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতির শিকার। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তারপরেও শিশুদেরই মূল্য দিতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ঘরবাড়ি হারিয়ে, স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্যুত হয়ে অনেক শিশুরই ঠাঁই হয় শহরের বস্তিতে। তাদের সুস্বাস্থ্য ও শিক্ষার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়।

শোষণমূলক শিশুশ্রম, শিশু বিয়ে এবং পাচারের ফাঁদে আটকা পড়ে যায় লাখ লাখ শিশুর জীবন। জলবায়ু পরিবর্তন ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মধ্যে একটা যোগসূত্র রয়েছে। ইউনিসেফের শিশুদের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৩ দেশের মধ্যে ১৫তম। শিশুরা জলবায়ু ও পরিবেশগত অভিঘাতের ক্ষেত্রে কতটা ঝুঁকিতে তা তুলে ধরে এই সূচক।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খরা বা সাইক্লোনের মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধির অর্থ হলো এতে আক্রান্ত পরিবারগুলো আরো দরিদ্র হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের সবচাইতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আরো বেশি ঝুঁকি তৈরি করছে। তারা তাদের শিশুদের পর্যাপ্ত খেতে দিতে পারছে না, তাদের সুস্থ রাখতে পারছে না। তাদের শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিবারগুলো যখন ঘরবাড়ি হারাচ্ছে, তখন সেই পরিবারের শিশুরা অর্থ উপার্জনের জন্য কোনো কাজে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে শিশুদের নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে বলে উল্লেখ করেছে ইউনিসেফের প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনটি বলছে, দায়িত্ব নিতে না পেরে মেয়ে শিশুদের অনেক পরিবার দ্রুত বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। এতে আরো বলা হয়, বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত অনেক পরিবার নিজের এলাকায় সর্বস্ব হারিয়ে এক পর্যায়ে কাজের খোঁজে শহরে চলে আসছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তিন জেলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও ভোলায় জলবায়ু পরিবর্তন ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলছে। ঘন ঘন দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছে ঐ জেলাগুলো।

বঙ্গোপসাগরের উপকূল ঘেঁষে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি সংকটকে আরো ঘনীভূত করছে। পানির লবণাক্ততাও একটি প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপকূলের অনেক এলাকা এখন এই সমস্যায় আক্রান্ত। অতিরিক্ত গরমও জলবায়ু পরিবর্তনের আরেক ধরনের প্রভাব। এতে ফসলের খেত নষ্ট হয়ে মানুষের জীবিকা সংকটের মুখে পড়ে।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট বলেন, জলবায়ু সংকটের সম্মুখভাগে রয়েছে বাংলাদেশের শিশুরা। এদের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে থাকা যেসব শিশু শহরের বস্তিতে বাস করছে, তাদের অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে এবং বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে, এমনকি যৌনকর্মীতে পরিণত হচ্ছে।

ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের জাতীয় পরিচালক সুরেশ বার্টলেট বলেন, শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ দূত। আমরা বিশ্বাস করি সমস্যা সমাধানে তাদের সম্পৃক্ত করলে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে, দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতির কারণ হতে পারে—এমন জলবায়ু বিষয়ক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে বৃহত্তর সহযোগিতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে আইইউসিএন কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ রাকিবুল আমিন বলেন, পরিবেশগত অবক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সম্পদের ঘাটতি, সংঘাত ও বাস্ত্তচু্যতি কষ্টার্জিত উন্নয়ন অর্জনগুলোকে প্রভাবিত করে। জলবায়ু সংকট নারী ও শিশুদের মতো অরক্ষিত গোষ্ঠীকে আরো নাজুক করে তোলে।


বিষয়:



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:

Top